মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, টেকসই সিদ্ধান্ত নিন

0
টেকসই সিদ্ধান্ত নিন

আজাদ সিরাজী: সম্প্রতি মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এসএসসি) প্রশ্নফাঁস মহামারী আকার ধারণ করা নিয়ে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। বিজ্ঞজনেরা বলছেন, বাহাত্তরের পরে মাধ্যমিক পরীক্ষায় এতো অরাজকতা কোন দিন হয় নি। বিষয়টির মারাত্মকতা অনুধাবন করতে পেরে সরকার, দেশবাসী সবাই এর একটা সুষ্ঠু সমাধাণ খুঁজতে শুরু করলেন। অনেক প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, নানা পেশার মানুষ সংবাদপত্র মারফত তাদের ধারণা গুলো শেয়ার করতে লাগলেন। প্রযুক্তি- কৌশল-প্রকৌশলসহ নানা আঙ্গিকের পরামর্শ ছিল ওগুলোতে। সত্যি বলতে ওসবের কতগুলো ধারণা ছিল চমৎকার, যুক্তিযুক্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত।

আমাদের শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে প্রশ্নফাঁসের পুরো বিষয়টিকেই অস্বীকার করলেও পরে বিষয়টির ভয়াবহতা তিনি বুঝতে পেরেছেন, এর সমাধাণের দিকে পা বাড়িয়েছেন। এজন্য তাঁকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না। তবে, আমার উদ্বেগ, তার তড়িৎ সমাধানের ঘোষণা নিয়ে।

‘প্রশ্নফাঁস’ ঠেকাতে ‘ইন্টারনেটের গতি স্লো’ করার মত সিদ্ধান্ত নিয়ে লোকমুখে হাসাহাসি না থামতেই (যদিও সিদ্ধান্তটি উইথড্র করা হয়েছিল) ঘোষণা করা হলো আগামী বছর থেকে সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি হবে। নতুন এই পদ্ধতিটি আবিষ্কার করা হলো কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী ও সচিবদের মিটিং থেকে।

প্রথম আলো জানাচ্ছে, ‘গত ২০ ফেব্রুয়ারী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেলা সোয়া তিনটা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আন্তমন্ত্রণালয়ের সভাটি শেষ হয়। এতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ছয় সচিব ও বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।’

একটি সুগঠিত প্রতারক চক্রের কবলে দেশজুড়ে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া, সরকার ও দেশবাসীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ‘প্রশ্নফাঁস’ নামক ব্যাধির সমাধান পেলাম আমরা মাত্র সোয়া দুই ঘন্টার এক বৈঠক থেকে। স্বীকার করে নিচ্ছি, বৈঠকটিতে অনেক শ্রদ্ধাভাজন, সুশিক্ষিত গুণীজনেরা ছিলেন। কিন্তু ১৪-১৫ লক্ষ শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে, দেশের মেরুদ্বণ্ড ‘শিক্ষা’ ব্যবস্থা নিয়ে এতো বড় সিদ্ধান্ত কোন গবেষণা ব্যাতিরেকে এক বৈঠকে নেওয়াটা আমি মানতে পারছি না।

এবার আসি নতুন পদ্ধতিটির অনুধাবণে। নতুন পদ্ধতিটির ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষাসংক্রান্ত দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংশোধন ও প্রশ্ন নির্বাচনের কাজটি একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হবে। ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের (শিক্ষক) কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা ‘প্রশ্নব্যাংকে’ রাখা হবে। সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি হবে। একাধিক প্রশ্ন সেট অনলাইনে পরীক্ষার আগ মুহূর্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হবে। সুরক্ষিত যন্ত্রের (ডিভাইস) মাধ্যমে এই কাজটি করা হবে।’

বলা হচ্ছে, পরীক্ষা শুরুর আধাঘন্টা আগে (সকাল ৯:৩০) ওই ডিভাইস ব্যবহার করে কেন্দ্র সচিবদের নিকট প্রশ্ন পাঠানো হবে। পরীক্ষার কক্ষ বড় হলে প্রয়োজনে কক্ষজুড়ে একাধিক বোর্ড ব্যবহার করা হবে, যেন পেছনের পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন দেখতে কোনো সমস্যা না হয়।

খুবই সুক্ষ্ণ চিন্তার সমাধাণ এটি। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সাবাস! এ করে পরীক্ষা নিলে তো ‘প্রশ্নফাঁসের’ তো কোন ফোকরই রইল না। কিন্তু, আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, প্রশ্নফাঁসের সবগুলো ফোঁকর বন্ধ করতে পারলেই কি সব ল্যাঠা চুকে গেলো? পরীক্ষাটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানসম্মত হলো কিনা, সেটা নিশ্চিত করতে হবে না?
বিজ্ঞানের ধারনা নেই যাদের তারা প্রশ্ন করতেই পারে, এই পদ্ধতির খুঁত কোথায়, ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানসম্মত’ হবে না কেন? তাদের প্রশ্ন করবো, ‘এই পদ্ধতিটি যে নিখুঁত হবে, তার প্রমাণ কী? কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে? গবেষণা করা হয়েছে? বা এই পদ্ধতিটির বিশুদ্ধায়ণ প্রমাণের জন্য কোন ঐশ্বরিক বাণী-বিবৃতি আছে?’

সবগুলোর উত্তর- না। অনেকে বলতে পারেন, ‘ভবিষ্যতে গবেষণা করা হবে, হাতে একবছর সময় আছে।’ আমি বলবো, ভরসা পাই না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এ পদ্ধতি প্রয়োগের আগে ডেমু নেওয়া হবে, পাইলটিং করা হবে। আমি বলবো, পাইলটিং আর গবেষণা এক জিনিস নয়। পাইলটিংয়ে একটা প্রকল্পের ফিজিবিলিটি পরীক্ষা করা হয়। আর গবেষণায় একটা প্রকল্পের তাত্বিক ও ব্যবহারিক পরিশুদ্ধতা অর্জন করা হয়।

অতীতেও শিক্ষাসংক্রান্ত এ ধরণের অনেক সমস্যা ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কয়েকটি ডেমু নিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়ণে দিয়েছিল (যেমন, সৃজনশীল পদ্ধতি)। ফলে, উন্নতবিশ্বে বহুল ব্যবহারের নজীর থাকা সত্ত্বেও ওইসব প্রকল্প চলাকালীন সময়ে বহু প্রতীবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অগত্য, বার বার প্রকল্পগুলোর ধরণে, গঠনে এমনকি বেসিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। ফলাফল, লাখ লাখ শিক্ষার্থী গবেষণাগারের গিনিপিগ! আপনি যদি মনে করেন, ঐগুলোই গবেষণা, তবে কিছু বলার নাই।

শিক্ষামন্ত্রী ও এতদ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তপ্রণেতাদের অনুরোধ করবো, আপনারা যেহেতু এসএসসিতে নতুন ব্যবস্থা আনতেই চাচ্ছেন, আর এর আগে এক বছর সময় পাচ্ছেন, এই সময়টা জুড়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবেষণা করেন। শুধু ডেমু পরীক্ষা নিলেই চলবে না। শহর আর মফস্বলের দু’টো স্কুলে দুই দুইয়ে চারটি সাঁজানো পরীক্ষা নিয়েই একটা পদ্ধতিকে ‘সঠিক’ সার্টিফিকেট দিয়ে ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর ঘারে চাপানো ‘উচিত কাজ’ বলে মনে করি না।

আমার অনুরোধ, শহর, গ্রাম, পাহাড়, বিল, প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন ভূ-সামাজিক এলাকা থেকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে স্যাম্পল সিলেকশনের মাধ্যমে স্কুল গুলোতে ডেমু পরীক্ষা নিয়ে, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সাথে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন করে, কেইজ স্টাডি করে আসন্ন পরীক্ষার আগেই নতুন পদ্ধতির সমস্যা, সমাধান, কৌশল, নীতিমালা এগুলো বের করুন।

আর এক্ষেত্রে আপনাদের গৃহীত সিদ্ধান্তটিই নয় মিডিয়ায় প্রকাশিত অন্যন্য বিজ্ঞজনদের বিভিন্ন কৌশল নিয়েও গবেষণা করুন। একাধিক অল্টারনেটিভ নিয়ে গবেষণা করুন, তাহলে সবচেয়ে কার্যকরতম সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

এক্ষেত্রে বলতে দ্বিধা নেই, আপনারা আন্তঃমন্ত্রনালয় বৈঠকে যে সিদ্ধান্তগুলো নিলেন,
এরকম অনেক আইডিয়া, মতামত মিডিয়ায় বেশ কিছুদিন ধরেই লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু, আপনাদের গৃহীত মডেল বা মিডিয়ায় প্রচারিত গুণীজনদের মতামতের প্রায় সবই ‘প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু ধারনা বা আইডিয়া মাত্র।’ এসব ধারণার পেছনে যথেষ্ট পরিমাণে ‘ব্যবহারিক গবেষণা রয়েছে’ বলে আমার জানা নেই। যেসব কাঠামোবদ্ধ ধারনা বা প্রস্তাব যথেষ্ট পরিমাণে গবেষণার দ্বারা পরীক্ষীত নয়, বিজ্ঞানের বিচারে, ওই সমস্ত ধারণাকে আমরা ‘হাইপোথিসিস’ হিসেবে ধরতে পারি। কোন হাইপোথিসিস ও তৎসংলগ্ন মডেল নিয়ে সবিস্তার গবেষণা, তাত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি দিতে না পারলে সেগুলোকে আমরা কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়ণের জন্য পাঠাতে পারি না।

পাঠকের প্রশ্ন থাকতে পারে, শিক্ষামন্ত্রণালয় নির্দেশিত নতুন পদ্ধতিটির ব্যবহারিক ত্রুটি আলোচনা না করে আমি এতো তত্ব কপচাচ্ছি কেন? সেক্ষেত্রেও আমার বক্তব্য, একটা হাইপোথিসিস নিয়ে গবেষণা না করে আমরা এর ভূল ধরতে পারি না।

গণমাধ্যম সুত্রে জানা যায়, পরীক্ষার জন্য নতুন যে দুটি ডিভাইসের কথা ভাবা হচ্ছে, এগুলোর একটি হলো পরীক্ষার হলে ট্যাবের মতো ছোট একটি ডিজিটাল যন্ত্রের ব্যবহার, যা পরীক্ষার্থীরা ব্যবহার করবে। এ পদ্ধতিতে ডিজিটাল ‘প্রশ্নব্যাংকে’র মাধ্যমে অটোমেটিক (স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাৎক্ষণিক) প্রশ্নপত্র তৈরি হবে। পরীক্ষা শুরুর আগে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্নের ‘কোড’ জানিয়ে দেওয়া হবে। পরীক্ষার্থীরা নিজ নিজ আসনে বসলে তাদের একটি করে ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়া হবে। পরীক্ষা শুরুর আগে (সকাল সাড়ে ৯টায়) ডিভাইসে অটোমেটিক প্রশ্ন ভেসে উঠবে।

তবে, কার্যক্ষেত্রে এই পদ্বতিটির যেসব সমস্যা দেখা যেতে পারে, সে সম্পর্কে আমার অনুমান, পাহাড়, হাওর, বিল, দ্বীপ ও অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকার পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে এই উপরিউক্ত পদ্ধতির যন্ত্রপাতি সরবরাহ, দুয়েকটা যন্ত্র নষ্ট হয়ে গেলে করণীয়, পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে নষ্ট হয়ে গেলে করণীয়, দুয়েকটা যন্ত্রে বা কেন্দ্রে বা কোন নির্দিষ্ট এলাকায় ‘কোড’ যেতে সমস্যা হলে বা দেড়ি হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক করণীয় নির্ধারণ, সারাদেশে একই সাথে সব জায়গায় বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, এই প্রক্রীয়ার সাথে জড়িত যন্ত্রপাতি সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রশিক্ষণ প্রদান, যাদের চোখে সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য বিকল্প নির্ধারণ প্রভৃতি কর্মকান্ডে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে প্রান্তিক পর্যায়ে এমনও ছেলেমেয়ে আছে যারা এসএসসি, এইচএসসি পাশ করে ফেলে অথচ মোবাইল টিপতে জানে না। আর নতুন কোন যন্ত্র যা কেউ কোন দিন দেখে নি, সেটা পরীক্ষার হলে প্রথমবার দেখেই যে কেমন অনুভূতি হবে, সেই অনুভূতি, সেই জরতা বা ভয় কাটাতে কি পদ্ধতি হাতে নেওয়া হবে, সেটাও এক মস্ত গবেষণার বিষয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন গতকাল বৃহস্পতিবার তার কার্যালয়ে সমকালকে বলেন, এ পদ্ধতিতে ইন্টারনেট ছাড়াই প্রশ্নপত্র পাঠানো সম্ভব হবে। প্রতিটি যন্ত্রের (ডিভাইস) মূল্য পড়বে আনুমানিক দেড়শ’ ডলার (প্রায় ১২ হাজার টাকা) করে। সচিব জানান, তারা হিসাব করে দেখেছেন, এতে সরকারের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা লাগবে। প্রতিটি যন্ত্র কমপক্ষে পাঁচ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। ইন্টার্নেট লাগবে না খুব ভালো কথা, কিন্তু, তিন হাজার কোটি টাকার অঙ্কটা কি খুব ছোট? এর চেয়ে সাশ্রয়ী অথচ এর চেয়ে কার্যকরী কোন উপায়ই কি আর নেই? -গবেষণা করুন।

লেখক: সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট বাংলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here