কোটা শোষণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একগুচ্ছ ভাওতাবাজী

0
ভাওতাবাজী

শামসুদ্দোহা মৃধাঃ

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটার ব্যাপারে আমার অবস্থান পরিস্কারভাবে বলতে চাই। আহত/নিহত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে পারিবারিকভাবে দিতে হবে। মেধার প্রতিযোগীতার ক্ষেত্রে তাদের আলাদা সুবিধা কোনভাবেই মানা হবে না। কোটাধারীরা কোন অধিকারে অন্যের হক নষ্ট করে ফাকা ফায়দা নিয়ে আবার বড় গলায় কথা বলে বেড়ায়? তাদের বাপ-দাদা দেশ স্বাধীন হওয়ায় অবদান রেখেছে বলে তারা প্লেটের অর্ধেক ভাত খাবে আর বাকী সবাই অর্ধেক? মুক্তিযুদ্ধ কি এই জন্য হয়েছে? সুযোগ-সুবিধা যা নেওয়ার সেটা পারিবারিকভাবে বা অন্যকোন পন্থায় নিতে হবে যেন অন্যের হক নষ্ট না হয়। মেধার প্রতিযোগীতায় তাদের অবশ্যই আর দশজনের মতো স্বাভাবিক মান নিয়ে প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা করে চাকরি পরীক্ষা নেওয়াও মানি না। আমি বিশ্বাস করি আজ হোক, কাল হোক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা সুবিধা একদিন উঠে যাবেই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটার সংস্কার করে ১০ শতাংশ করার যে ‘জ্বী হুজুর’ মার্কা প্রস্তাব তাতে আমার কোন সমর্থন নাই। যতদিন তাদের জন্য আলাদা কোটা করার কোন কারণ না খুজে পাব ততদিন আমি আমার এই অবস্থানে অনড় থাকব।

আজ নৌমন্ত্রী বললেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের মেধা একটু কম থাকলেও লিখিত পাশ করলেই তাদের চাকরি দিতে হবে’। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের মেধা কম, এই ওহী আপনাকে কে দিল মন্ত্রী সাহেব? আপনি তো তাঁদের অপমান করলেন এই বক্তব্যের মাধ্যমে। অবশ্য আপনারা তাঁদের যত অপমানই করেন না কেন, তাঁরা টু শব্দ করবেন না। আসলে করার সাহস রাখেন না। যার নুন খেয়ে বড় হয় তার সাথে বিবেক ব্যবহার করা কঠিন। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁর সন্তানরাও এর উর্ধ্বে যেতে পারেন নাই। এখন আসি পরের কথায়, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা লিখিত পাশ করলেই তাঁদের চাকরি দিতে হবে। আমার প্রশ্ন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা লিখিত পাশ করলেই চাকরি পাবে কেন? কোন যুক্তিতে?

আপনি আরও বললেন, ‘আগামী ২০ বছর পর দেশে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। তখন গুটিকয়েক মুক্তিযোদ্ধা থাকবেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে পারবেন না। সে কারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৩০ শতাংশ কোটা চালু রেখেছেন। যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকে’। আসলে আওয়ামী লীগ কেন কোটা বাতিলে কখনো কথা বলে না এর সোজাসাপ্টা উত্তর মন্ত্রীর বক্তব্যের এই অংশ। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এঁদেরকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করলে যতোটা সুরক্ষা পাওয়া যায়, অন্য কোন বয়ান ততোটা মানুষ ঠিক খায় না। তাই আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র স্বপক্ষের শক্তি এই কার্ডখানা হাতে পেতে মানে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাখতে যতো বৈষম্য করার প্রয়োজন হয় তাঁরা করবে। পৃথিবীর কোথাও আপনি এমন অদ্ভুত আশঙ্কা দেখবেন না, যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনা বিলুপ্ত হওয়ার ভয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটায় সুবিধা দিয়ে চেতনা সমুন্নত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। চেতনা রক্ষায় পৃথিবীর বুকে এই এক অনন্য নজীর।

আপনি বললেন, ‘দেশে বর্তমানে পুলিশ ও বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে রাজাকারদের সন্তান খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীনতা বিরোধী এ গোষ্ঠীর সন্তানদের নিয়ে প্রশাসন চালানো যায় না। তাদের দিয়ে প্রশাসন চললে মুক্তিযুদ্ধে চেতনা ও ইতিহাস ধ্বংস হয়ে যাবে’। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামাত-শিবিরকেই বোঝায়। এটা সবার জানা। তো, একদিকে জামাতকে রাজনীতি করতে দেবেন, এমনকি অতীতে তাঁদের সাথে এক টেবিলে বসে পিরিচ ভাগাভাগি করে চা খেয়েছেন, দোয়া নিয়েছেন আবার আপনারাই মাইকে ফাটা গলায় সারাক্ষণ নিল নিল জামাত নিল করে বেড়াবেন। মানে জামাত বিষয়ে আদেশ-নিষেধ সব আপনাদের খেয়াল খুশি মত সবাইকে মেনে নিতে হবে? তাহলে আমরা ধরতে পারি, জামাত হল সেই জিনিস, যার পাছায় লাথির প্রয়োজন হলে আপনারাই লাথি দেবেন, আবার চিরকাল যেন এই চোর-পুলিশ খেল খেলা যায় সেজন্য জামাতকে জিইয়েও রাখবেন আপনারাই। মানে জামাত আপনাদেরই একটা পুতুল, হোক সেটা ট্যাবু। যখন যেভাবে প্রয়োজন সুযোগ বুঝে ব্যবহার করবেন। সংবিধানের কোথাও তাঁদের চাকরিতে প্রবেশে বাধা আছে কিনা আমার জানা নেই এবং যতটুইকু জানি তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সব সুযোগ সুবিধাই পাবে। তাহলে সংবিধান বিরোধী এমন কথা বলে বেড়ান কেন? যার কোন কার্যকারিতা নাই মানে পুরোটাই ফাঁপা বুলি। আবার মুক্তিযোদ্ধারাও কম যান না আওয়ামী লীগের এই ‘বিপ্লবী কথা’ শুনে তাঁরাও গলে একেবারে পানি হয়ে যান! যেন আওয়ামী লীগ জামাতকে আইন করে নিষিদ্ধ করে দিল।

একাত্তরে শহীদ/গাজী মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন কাহিনীকে পুঁজি করে যারা কোটা বহাল রাখতে চায় তাদেরকে প্রশ্ন করতে শিখুন। আজ কোটা ভক্ষকদের ফাঁপা আবেদনে সাড়া দিয়ে হয়ত সাময়িক বাহবা কুড়াবেন কিন্তু যেদিন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে নিজের পাওনাটা না পাবেন; পরিবার, সমাজ, বন্ধুদের মাঝে নিজেকে বেকার হিসেবে আবিস্কার করবেন, সেদিন আপন মনেই প্রশ্ন উঠবে, কী করেছিলেন অতীতে। স্বল্প কর্মসংস্থানের বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগীতার জায়গাটাও কোটায় সমর্থন দিতে গিয়ে নষ্ট করে দিয়েছেন। শুধু নিজের না, অন্য দশজনের অধিকার লুন্ঠনেও আপনি সায় দিয়েছেন। সেদিন কপাল চাপড়িয়ে আন্দোলনে গিয়েও লাভ হবে না।

কেউ কেউ বলবে, কই? চাকরি পেতে তো আমাদের কোটার প্রয়োজন হয় নাই! তাদের ব্যাপারটা এমন ২০ জন মানুষের মধ্যে ১০টাকার ২০টি নোট বন্টন করার কথা। সেখান থেকে প্রথম ৩ জনের মধ্যে ৩০টাকা করে ৯০টাকা ভাগ করে দেয়া হয়েছে। বাকী ১১০ টাকা, অবশিষ্ট ১৭ জনের মধ্যে উড়িয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, এই যে তোমাদের পাওনা দিলাম যে যেভাবে নিতে পারো নিজেদের ভাগ নিয়ে নাও। যে ক’জন লুফে নিতে পেরেছে, টাকার বন্টন বৈষম্য নিয়ে তাদের আর কোন মাথা ব্যাথা নাই। মাথা ব্যাথা কেবল বাকীদের যারা পায় নাই। প্রশ্ন করতেই পারেন, তাহলে বন্টন ব্যবস্থার প্রথম থেকেই তারা প্রতিবাদ করলো না কেন? উত্তরে বলব কোটাবিহীন মানুষগুলোকে জিজ্ঞাসা করুন তাদের সেই সুযোগ, সামর্থ, স্পেস ছিল কিনা? আসলে এই চলমান বৈষম্যের বাজারে প্রতিবাদ-গোসসা এবং অংশগ্রহণ দুটোই একসাথে চালাতে হয় নইলে আত্মহত্যা ছাড়া উপায় থাকবে না।
মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যুদ্ধে গিয়েছে এমনটা শুনেই বড় হয়েছি। কিন্তু হাল আমলে তেমনটা আর মনে হয় না। বিশ্বাস রাখি মুক্তিযোদ্ধারা বৈষম্যে সমর্থন দিয়ে কারও পাতা ফাঁদে পা দেবেন না। তাঁরা কোন একক রাজনৈতিক দলের না। তাঁরা সবার।

এখন সংক্ষেপে একটু বলি, কোটা বিরোধিতাকারীদের সব সময় দমিয়ে রাখাকে আমি যেভাবে দেখেছি, সেই কথা।

গতকাল মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের নেতারা বললেন, কোটার বিরোধাতাকারীরা খালেদার অনুসারী। শুনে খুব আশ্চর্য হই নাই। আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতার সাথে নির্বাচনী বছরে এই ধরণের রসালো বুলিতে স্বাভাবিকভাবেই সরকার পক্ষের ভক্তি আরও বেড়ে যাবে। যেমনটা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের গোলাম কুদ্দুছ সাহেব প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দৈনিক তিন বেলা নিয়ম করে দেশকে মৌলবাদের উত্থান শঙ্কা খাওয়ানোর চেষ্টা করেন।।

মেধার প্রতিযোগীতার প্লাটফর্মে কোটাধারী পরগাছা ও মুক্তিযুদ্ধের অপব্যাখ্যা পোষা মুরিদরা অতীতেও সরকারের ‘আচলের লোক’ প্রমাণে এইসব রসালো অভিযোগ করেছে, সামনেও করবে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের এই গুটির চালকে হ্যান্ডেল করেই আন্দোলন করতে হবে। এখন কোটা সংস্কারের যে দাবী তোলা হয়েছে এটা আসলে সরকারের ভেতরেই বঞ্চিতদের সমর্থনের ফল। তাই এই সংস্কার আন্দোলনে আমার কোন সমর্থন নাই।
নিকট অতীতে চোখ রাখুন, কোটা যখনই সংস্কারের দাবী জানানো হয়েছে, তখনই আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামাত-শিবিরের এজেন্ট আখ্যা দেয়া হয়েছে। কখনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠায় আরও উন্নত গোজামিল যোগ করা হয়েছে এই বলে, ওরা আন্দোলনের নামে সরকার ও দেশকে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিতে চায়। ওরা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অস্বীকার করে। একই সময়ে আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট পেজগুলোতে দেখবেন একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ কাহিনী ঘুরঘুর করছে যার শেষ ৫-১০ লাইনে কোটার ফজিলত বয়ান করছে এবং কোটার বিরোধীতা করে জাতি হিসেবে আমরা কতটা নির্লজ্জ তার একটা সস্তা, ফাপা ভাবাবেগে ভরা ওয়াজ শোনানো হচ্ছে। সাথে এই ধরণের চটকদার একটা ডায়লগ চোখে পড়ে যেতে পারে- সাঈদী জেলে বসে পোলাও-কোরমা খায় আর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা দু’টো ভাত-কাপড়ের জন্য রাস্তায় ব্যানার হাতে ভিক্ষা করে! ধিক্ এই বাংলাদেশকে! আজ রাজাকারের প্রেতাত্মারা সাধারণ ছাত্রের মুখোশে আন্দোলনে নেমেছে। আর অমনি শুরু হয়ে যায় কোটার বিরোধাতাকারীদের দমন-নিপীড়ন।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here